রাত ১:০১ সোমবার ২৯শে নভেম্বর, ২০২০ ইং

ব্রেকিং নিউজ:

কুমিল্লা দেবিদ্বারে ৫০ টাকার লোভ দেখিয়ে ৭ বছরের শিশুকে ধর্ষণ। | কুমিল্লা সদরে ডিবি পুলিশের অভিযানে অস্ত্র ও ৫ শত পিছ ইয়াবাসহ এক এক যুবক। | সিলেট চেম্বারের পরিচালনা পরিষদের ২০১৯-২০২১ সাল মেয়াদের দ্বি-বার্ষিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত | কুমিল্লা সদর দক্ষিণে যাত্রীবাহি বাসচাপায় ৩ মোটরসাইকেল আরোহী নিহত। | মাধবপুরে দুই কেজি গাঁজা সহ ২ মাদক পাচারকারী আটক | ছেলের জন্য সকলের কাছে দোয়া চাইলেন ক্রিকেটার রুবেল | পুত্র সন্তানের বাবা হলেন রুবেল, মা-ছেলে দুজনেই সুস্থ আছেন | মাদক চোরাকারবারীদের ফাঁদে পরে, বিলিনের পথে মাধবপুরের চা শিল্প! | কুমিল্লা সদরে ট্রেনে কাটা পড়ে দুই ষ্কুল শিক্ষার্থী নিহত। আহত-৩ | কুমিল্লায় গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে ৫ হাজার পিছ ইয়াবাসহ সাংবাদিক শামীম আটক। |

ধর্মীয় সহিষ্ণুতার মর্ম ও মূলনীতি

নিউজ ডেস্ক | জাগো প্রতিদিন .কম
আপডেট : April 23, 2018 , 2:18 am
ক্যাটাগরি : ধর্ম
পোস্টটি শেয়ার করুন

ধর্মীয় সহিষ্ণুতার মর্ম ও মূলনীতি

সমাজজীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ধর্ম ও বিশ্বাসের ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সংঘাত-সংঘর্ষকে উপেক্ষা করবে জীবনের প্রত্যেক পর্বে।  ধর্ম ও বিশ্বাস সেখানে চালিকা হিসেবে কাজ করবে; কিন্তু তার মৌলিকতায় কোনো ছেদ ঘটাবে না।  সুতরাং ধর্মীয় সহিষ্ণুতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা হবে শান্তিপূর্ণ এক সমাজব্যবস্থা, যেখানে ধর্ম ও বিশ্বাসের কারণে কোনোরকম ঝগড়া-বিবাদ থাকবে না, থাকবে না কোনো অন্যায় অবিচার।  নিরাপত্তা

পাবে সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু সবাই

বাংলা একাডেমির

অভিধানে ‘সহিষ্ণু’ শব্দের অর্থ লেখা হয়েছে ‘সহনশীল’, ধৈর্যশীল, ক্ষমাশীল, প্রতীক্ষাশীল।  যার বিশেষণ হলো ‘সহিষ্ণুতা’।  এ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো ঞড়ষবৎধহপব এবং আরবিতে ‘আত-তাসামুহ’ ও ‘আত-তাফাউত’ ব্যবহার করা হয়।  সেসব অর্থ পর্যালোচনা করলে ‘ধর্মীয় সহিষ্ণুতা’ বলতে বোঝায় ধর্মীয়ভাবে, ধর্মীয় কারণে কিংবা ধর্মীয় কোনো বিষয়ে অন্যের প্রতি সহনশীল হওয়া বা সহনশীলতার পরিচয় দেওয়া।  এটি অন্যকে, অন্যের মত, আদর্শ ও বিশ্বাস সহ্য করার ক্ষমতাও বটে।

ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ইসলামের অন্যতম একটি মৌলিক শিক্ষা ও সৌন্দর্য।  গুরুত্বপূর্ণ এ মূলনীতি শুধু ইসলামকে সর্বজনীনতার স্বীকৃতি এনে দেয়নি বরং স্বল্প সময়ের ব্যবধানে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর জীবদ্দশায় বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাদুমন্ত্র হিসেবে কাজ করেছে।  ইসলামের সুমহান বাণী তাই সর্বস্তরের মানুষের কাছে যেমনি গ্রহণযোগ্য হয়েছে, তেমনি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নিশ্চয়তা দিয়ে সামাজিক জীবনে এনে দিয়েছে শান্তি।  ইসলামের দেখানো ধর্মীয় সহিষ্ণুতার উদাহরণ তাই যুগে যুগে অনুকরণীয় অনুসরণীয়।  অথচ বর্তমান বিশ্বের ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা সচেতন সবার বিবেককে তাড়া করছে।  উপায় খুঁজে বের করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে বিবেকবান সব চিন্তাশীল; কিন্তু সেখানে উপেক্ষিত হয়েছে ইসলামের শিক্ষা।  ইসলামের প্রত্যেকটি বিধানের যেমন শরয়ি উদ্দেশ্য রয়েছে তেমনি রয়েছে তার মূলনীতি।  এসব উদ্দেশ্য ও মূলনীতি না জানার কারণে অনেক সময় ‘শারে’ বা বিধানদাতার ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে না।  এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

ধর্মীয় সহিষ্ণুতার শরয়ি উদ্দেশ্য

আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন : ইসলামি বিধিবিধানের মূল লক্ষ্য দুনিয়াবি কোনো কিছু অর্জন না বরং তা শুধু মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে।  এ ক্ষেত্রেও সহিষ্ণুতার মূল উদ্দেশ্য হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।  কারণ, আল্লাহর বিধানই হলো অন্যের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে দুনিয়াবি জীবন পরিচালনা করা যতক্ষণ তা তাওহিদের সাংঘর্ষিক কিংবা অন্য কোনো মৌলিক বিধানের বিপরীত না হবে।  আল্লাহ ঘোষণা করেন, ‘বলুন, হে আহলে কিতাবরা, একটি বিষয়ের দিকে আস যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে সমান যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করব না, তাঁর সঙ্গে কোনো শরিক সাব্যস্ত করব না এবং একমাত্র আল্লাহকে ছাড়া কাউকে পালনকর্তা বানাব না। ’ তারপর যদি তারা স্বীকার না করে, তাহলে বলে দাও যে, ‘সাক্ষী থাক আমরা তো অনুগত। ’ (সূরা আলে ইমরান : ৬৪)।

রাসুলুল্লাহ (সা.) এর হাদিসেও এর প্রত্যয়ন পাওয়া যায়।  আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘যার মধ্যে তিনটি গুণ থাকে সে ঈমানের মিষ্টতা লাভ করে থাকে।  আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) তার কাছে অন্য সব কিছু থেকে অধিক প্রিয় হবে; কাউকে ভালোবাসলে শুধু আল্লাহর জন্যই ভালোবাসবে।  আর কুফরি থেকে তাকে আল্লাহ বাঁচানোর পর ফের তাতে ফিরে যাওয়াকে এমন অপছন্দ করবে, যেমন সে নিজেকে আগুনে নিক্ষিপ্ত করাকে অপছন্দ করে। ’ (বোখারি : ৬০৪১; মুসলিম : ১৩)।

সহাবস্থান নিশ্চিত করা : শরয়ি দৃষ্টিভঙ্গিতে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার দুনিয়াবি উদ্দেশ্য হলো সামাজিক জীবনে একে অন্যের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা।  এটি মোটেও এমন নয় যে, অন্য ধর্ম বা ধর্মীয় বিশ্বাসকে মেনে নেওয়া বা নিজেকেও সে অনুযায়ী পরিচালনা করা।  বরং সে ধর্ম বা বিশ্বাসকে এ জন্য সহ্য করা যে, সেটি তাদের জন্য প্রযোজ্য।  (সূরা কাফিরুন : ৬)।  শুধু ধর্মীয় কারণে বা বিশ্বাসের ভিন্নতার কারণে কারও সঙ্গে এমন আচরণ করা যাবে না, যা অসহিষ্ণুতা ও সংঘর্ষের দিকে নিয়ে যায়।  প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ড. জামাল বাদাভি বলেন, ‘মুসলিম-অমুসলিম সুসম্পর্কের মূল ভিত্তি ও উদ্দেশ্য হলো শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিতকরণ, ন্যায়পরায়ণতা এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ…। ’

ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করা : ধর্মীয় সহিষ্ণুতার অন্য একটি উদ্দেশ্য হলো ইসলামি ভ্রাতৃত্ববোধকে প্রতিষ্ঠা করা।  এটি এমন এক চেতনা, যাতে একে অন্যদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করাকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে।  শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এ বোধ অনস্বীকার্যও।  কারণ, ইসলামি মূল্যবোধের শিক্ষা হলো সমগ্র মানবজাতি এক পিতা থেকে এসেছে।  (সূরা নিসা : ০১)।  এবং সে পিতার সব সন্তানকে আল্লাহ তায়ালা নিজেই সম্মানিত করেছেন অন্য সব সৃষ্টির ওপর।  (সূরা আল-ইসরা : ৭০)।  এখানে ভেদাভেদ করা হয়নি ভিন্ন ধর্ম, ধর্মীয় বিশ্বাস, মত, পথ, আদর্শকে।  এত যে ভিন্নতা এগুলো একে অপরের মধ্যে পরিচয়ের মাধ্যম।  তবে, সৃষ্টিকর্তার সামনে সম্মানিত সে যে তাকওয়াবান।  (সূরা হুজরাত : ১৩)।

ধর্মীয় সহিষ্ণুতার মূলনীতি

ধর্মীয় সহিষ্ণুতার কিছু মূলনীতি আছে।  তাছাড়া চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়।  ইসলামের প্রত্যেকটি বিধানে মূলনীতি আছে।  সে ক্ষেত্রে কিছু মূলনীতি আছে যা অবশ্যম্ভাবীভাবে পালনীয়।  যেমন

সামাজিক শান্তিই মূল ভিত্তি : সামাজিক শান্তিই হবে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার মূল ভিত্তি।  সমাজজীবনে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ধর্ম ও বিশ্বাসের ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে সংঘাত-সংঘর্ষকে উপেক্ষা করবে জীবনের প্রত্যেক পর্বে।  ধর্ম ও বিশ্বাস সেখানে চালিকা হিসেবে কাজ করবে; কিন্তু তার মৌলিকতায় কোনো ছেদ ঘটাবে না।  সুতরাং ধর্মীয় সহিষ্ণুতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা হবে শান্তিপূর্ণ এক সমাজব্যবস্থা, যেখানে ধর্ম ও বিশ্বাসের কারণে কোনোরকম ঝগড়া-বিবাদ থাকবে না, থাকবে না কোনো অন্যায় অবিচার।  নিরাপত্তা পাবে সংখ্যালঘু কিংবা সংখ্যাগুরু সবাই।  ফলে শান্তিই হয়ে উঠবে জীবনের এক বাস্তব অধ্যায় হিসেবে।

উভয়ের পারস্পরিক সদিচ্ছা : সহিষ্ণুতা উভয় পক্ষ থেকেই হতে হবে।  অর্থাৎ সহনশীলতা, ক্ষমাশীলতা, ধৈর্যের বহিঃপ্রকাশ একপক্ষ থেকে হলে হবে না।  এটি এ জন্য যে, উভয় পক্ষই চায় সম্প্রীতি বজায় থাকুক এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত হোক।  একপক্ষ সহিঞ্চু হলেও অন্য পক্ষ্যের অসহযোগিতা সংঘাত-সংঘর্ষের দিকে নিয়ে যাবে এটাই বাস্তব।

নির্দিষ্ট লক্ষ্য স্থির করা : ধর্মীয় সহিষ্ণুতা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে হতে হবে এবং তা অবশ্যই সামাজিক বিষয়গুলোতে হবে।  এটি ধর্মের কোনো মৌলিক বিশ্বাস-অবিশ্বাসের বিষয়ে হতে পারবে না।  সে ক্ষেত্রে উভয়ের পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্যে সামাজিক ন্যায়পরায়ণতা ও মানবাধিকারের বিষয়গুলোই এ জন্য প্রাধান্য পাবে যে, তারা নিজেদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় রেখে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায়।  এ উদ্দেশ্যের ব্যত্যয় ঘটলে হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি হবে।

ধর্মীয় সহিষ্ণুতা শুধু ভিন্ন ধর্ম ও বিশ্বাসীর সঙ্গে নয় বরং এটি হতে পারে একই ধর্মের অনুসারীর ভিন্ন মতাবলম্বীর ওপর।  কিন্তু এটি ততক্ষণ পর্যন্ত পালিত হবে যতক্ষণ একজনের ধর্ম, ধর্মীয় বিশ্বাস কিংবা কার্যাবলি অন্য কোনো ধর্ম, তার অনুসারী ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীর জন্য ক্ষতির কারণ না হবে।

পরিশেষে বলব যে, শরয়ি বিধিবিধানের উদ্দেশ্য ও মূলনীতি জানা থাকলে সে বিধান পালনে যেমন আগ্রহ তৈরি হবে, তেমনি তা উপভোগ্য ও আনন্দদায়ক হবেÑ এটা স্বাভাবিক।  তাছাড়াও নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সঠিক মূলনীতি জানা ও সে আলোকে তা পালন করা অত্যাবশ্যক।  শরয়ি বিষয়ে তাই মূলনীতি বিচ্যুত হলে লাভের চেয়ে ক্ষতির আশংকাই বেশি।  সুতরাং ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সম্প্রীতির জন্য যারা কাজ করবেন  সর্বোপরি সব মুসলিমের জন্য এসব বিষয়ে ধারণা থাকা খুবই জরুরি।