রাত ১২:৪৬ বুধবার ১লা ডিসেম্বর, ২০২০ ইং

ব্রেকিং নিউজ:

কুমিল্লা দেবিদ্বারে ৫০ টাকার লোভ দেখিয়ে ৭ বছরের শিশুকে ধর্ষণ। | কুমিল্লা সদরে ডিবি পুলিশের অভিযানে অস্ত্র ও ৫ শত পিছ ইয়াবাসহ এক এক যুবক। | সিলেট চেম্বারের পরিচালনা পরিষদের ২০১৯-২০২১ সাল মেয়াদের দ্বি-বার্ষিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত | কুমিল্লা সদর দক্ষিণে যাত্রীবাহি বাসচাপায় ৩ মোটরসাইকেল আরোহী নিহত। | মাধবপুরে দুই কেজি গাঁজা সহ ২ মাদক পাচারকারী আটক | ছেলের জন্য সকলের কাছে দোয়া চাইলেন ক্রিকেটার রুবেল | পুত্র সন্তানের বাবা হলেন রুবেল, মা-ছেলে দুজনেই সুস্থ আছেন | মাদক চোরাকারবারীদের ফাঁদে পরে, বিলিনের পথে মাধবপুরের চা শিল্প! | কুমিল্লা সদরে ট্রেনে কাটা পড়ে দুই ষ্কুল শিক্ষার্থী নিহত। আহত-৩ | কুমিল্লায় গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে ৫ হাজার পিছ ইয়াবাসহ সাংবাদিক শামীম আটক। |

যানজট নিরসনে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা’

নিউজ ডেস্ক | জাগো প্রতিদিন .কম
আপডেট : May 19, 2018 , 7:59 am
ক্যাটাগরি : জাতীয়
পোস্টটি শেয়ার করুন

রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া গণপরিবহনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং যানজট নিরসন সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিশিষ্টজনেরা। রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে যানজট নিরসনের যথাযথ পদক্ষেপ থাকার তাগিদ দিয়েছেন তারা। প্রয়োজনে এই বিষয়ে রাজনীতিবিদদের প্রশিক্ষণ নেয়ার কথাও বলেছেন তারা।

শনিবার বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটে ‘গণপরিবহনব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং যানজট নিরসনের পরিকল্পনা রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্তি ও বাস্তবায়নে অঙ্গীকার’ শীর্ষক এক গোলটেবিলে বক্তারা এসব কথা বলেন। এর আয়োজন করে বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ১৬টি রাজনৈতিক দলকে তারা এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেখান থেকে আটটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি আসেন। তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও রাজপথের বিরোধী দল বিএনপির কেউ এই আলোচনায় অংশ নেননি।

আলোচনায় অংশ নিয়ে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘সড়কে এত মৃত্যুর মিছিল, বাসের চাপায় মানুষ মারা যাচ্ছে, সরকারের নেতারা বলছেন ‘আমরা কি বাস চালাই?’ ‘সড়কে উন্নয়নের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে’ সরকার এমন দাবি কেমনে করে? সড়কে মানুষের মৃত্যুর দায় সরকারকেই নিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘সরকার দলীয় নেতারা হৃদয়হীন আচরণ করছেন, হাত চলে যাচ্ছে যাত্রীর। বলা হচ্ছে হাত বের করে রাখলে যাবেই তো।’

মান্না বলেন, ‘আমরা ফুটপাত জয় করতে পারছি না, আবার বলছি সমুদ্র জয় করেছি। মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠানো আমাদের বড় অর্জন। কিন্তু আমাদের ফুটপাতও দখলমুক্ত রাখতে হবে। এই ছোট বিষয়টিও জয় করতে হবে।’

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক বলেন, ‘সড়কে যান নিয়ন্ত্রণে পলিসি মেকিংয়ের কথা বলি, ফান্ডামেন্টালের কথা বলছি, আমি বলব এখন একটা সোস্যাল মুভমেন্ট দরকার। এতে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের অন্তর্ভুক্তি না হলে কোনো কিছুই সম্ভব নয়।’

এসময় তিনি অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হলেও তারা কেউ না আসার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরাতো নির্বাচন কমিশনের তালিকাভুক্তই নই। আমরা সড়কে নিরাপত্তায় নীতিনির্ধারণে কী পদক্ষেপ নিতে পারবো।আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রতিনিধি দলের আসা উচিত ছিল। দলগুলোকে সড়কে নিরাপত্তা বিষয়টি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত ও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।’

কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘বড় দুটি দল আসেনি। হতাশার কিছু নেই। আজকে যারা বড় আছে, কালকে তারা নাও থাকতে পারে। তারা আসেনি বলে এমনটি ভাবার কারণ নেই সড়কে মৃত্যু নিয়ে তারা ভাবছে না। আমি মনে করি সবাই চায় সড়কে মৃত্যু কমাতে।’

কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘আমাদের গাড়ি ভালো না, রাস্তা ভালো না, ড্রাইভার ভালো না। এগুলো সবই ভালো করতে হবে। তাহলেই সুফল পাওয়া যাবে। চালকদের মূল্যায়ন করতে হবে, তাদের সম্মান দিতে হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের দেশে চালক ও যারা রান্না করে তাদের মূল্যায়ন হয় না। কিন্তু তাদেরেই বেশি মূল্যায়ন করা উচিত। সেটা উন্নত দেশে হয়।’

এসময় তিনি পরিবহন যারা পরিচালনা করেন তাদের সচেতন হওয়ার কথা বলেন। বলেন, পরিবহন পরিচালনা করে যারা সমস্যা তাদের।

‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘নিরাপদ সড়ক নিয়ে আমি ২৪ বছর ধরে কথা বলে আসছি। পলিটিশিয়ানরা যতক্ষণ পর্যন্ত ঠিক না হবে এটা ততক্ষণ পর্যন্ত ঠিক হবে না। রাষ্ট্রের লিডারদের নৈতিকতা থাকতে হবে।’

ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘আমাদের দুর্নীতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে জন্ম থেকে এটা শুরু। যে সন্তান সিজার ছাড়া ভূমিষ্ট হওয়ার কথা কিন্তু দেখা যায় তাকে সিজার করে পেট কেটে ভূমিষ্ট করা হচ্ছে। আবার তাকে যখন স্কুলে ভর্তি করাবো তখনও টাকার বিনিময় ভর্তি করাতে হচ্ছে। শুরুতেই এ অবস্থা সেখানে সৎ থাকবে কীভাবে।’

এই অভিনেতা বলেন, ‘আমাদের রাজনৈতি স্বার্থ চরিতার্থ করার মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে।’

নগরে অপরিকল্পিত ফ্লাইওভার নির্মাণের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘অপরিকল্পিত ফ্লাইওভারের কারণে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ যেখানে গাড়িগুলো নামছে সেখানে এসে আবার বসে রয়েছে।’

‘আমরা অনেক দেশে দেখি ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে ট্রেনলাইনও থাকে, কিন্তু বাংলাদেশে তেমন পরিকল্পনা দেখি না।’

ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদে রাজনীতিবিদদের সদিচ্ছার অভাব রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। বলেন, হকাররা যাবে কোথায় এটা কথা হতে পারে না। ফুটপাততো দোকান বসানোর জায়গা নয়।

এসয় তিনি রাজনীতিবিদদের নিরাপদ সড়কের গুরুত্বের বিষয়ে প্রশিক্ষণের ও গুরুত্বারোপ করেন।

পরিবহন খাতে দুর্নীতি, নৈরাজ্য বন্ধে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও মেয়রদের আরও বেশি দায়িত্ববান হতে অনুরোধ জানিয়ে বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘তাদের কথা ও কাজ যেন এক থাকে। তারা যেন দায়িত্বশীল কথা বলেন।’

যানজটে প্রতিদিন ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে

বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন অনুষ্ঠানে কিনোট পেপারে জানান, ঢাকা মহানগরীতে অসহনীয় যানজটে প্রতিদিন ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, বছরে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে ৩৭ হাজার কোটি টাকা।

‘মিটিগেটিং ট্রাফিক কনজেশন ইন ঢাকা: অ্যাপ্রোপ্রিয়েট পলিটিক্যাল এজেন্ডা’ শিরোনামে গবেষণা প্রতিবেদন পাঠের সময় তিনি বলেন, ঢাকা শহরের মোট দুর্ঘটনার ৭৪ শতাংশ ঘটে পথচারী পারাপারের সময়।

তিনি জানান, ঢাকা শহরে প্রতিদিন ৩৬ লাখ ট্রিপ দেয় গণপরিবহগুলো। এর ৮০ শতাংশ ট্রিপ দেওয়া হয় ইঞ্জিনচালিত ও ইঞ্জিনবিহীন পরিবহনে। আর এর যাত্রীর ৩৫ শতাংশ যায় কর্মক্ষেত্রে।

মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ঢাকার যানজটের কারণে পিক আওয়ারে গাড়ির গতিবেগ ঘণ্টায় পাঁচ কিলোমিটারে নেমে এসেছে, যেখানে পায়ে হেঁটে চলার গড় গতিও পাঁচ কিলোমিটার। ফলে প্রতিদিন ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে।

২২ হাজার কোটি টাকা বাঁচানো

যানজটে প্রতি বছর ৩৭ হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে জানিয়ে মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, নগরের কার্যকর ব্যবস্থা নিলে যানজট ৬০ শতাংশ কমানো যায়, এতে ২২ হাজার কোটি টাকা বাঁচানো যাবে। এসময় তিনি নগরের যানবাহন নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রাইভেট কোম্পানিগুলোকে নিয়ন্ত্রণে আনার পরামর্শ দেন।

তিনি বলেন, এখন ঢাকায় দেড়শ থেকে দুইশ বাস সার্ভিস চলছে। এটাকে প্রতিটি রুটে একটি করে কোম্পানিকে দায়িত্ব দিলে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। এতে করে সড়কে প্রতিযোগিতা কমবে।

আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালগুলো এখন কাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সেটা খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়ে মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, এখানে বিশৃঙ্খলা হচ্ছে। প্রয়োজনে সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যারা এখানে গাড়ি রাখবে তাদের কাছ থেকে ফি নেওয়া যায়। এ টার্মিনাল উন্নত করতে হবে। যাত্রীরা যেন সাচ্ছন্দে এখানে বসতে পারে।

যানজটের প্রভাবিত হচ্ছে মানব চরিত্র

অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, যানজটের কারণে মানব চরিত্রের নয়টি দিক নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগে প্রভাব পড়ছে নাগরিকদের। কর্মক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

গণপরিবহনে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীরা নানাভাবে নিগৃহীত হওয়ার কথাও উঠে আসে তার এই প্রতিবেদনে।

এসময় পরিবহন খাতে ভর্তুকির পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, আমাদের এতে লাভ হবে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ডিটিসিএ, সিসিএস, রাজউক, আরএইডি, এলজিইডি, বিআরটিএ-র মধ্যে একটি সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করার পরামর্শ দেন অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন। তিনি বলেন, চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স প্রদানে আরও বেশি সতর্ক হওয়া, নগরে অবৈধ পার্কিং বন্ধ করা, বাইসাইকেল লেন তৈরি, হাঁটার পথ তৈরি করাতে হবে।

এলিভেটেড টাওয়ার কার পার্কিং

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সহসভাপতি আবদুল হামিদ শরীফ বলেন, একটি বসাযোগ্য শহরের জন্য ২৫ শতাংশ ভালো সড়ক প্রয়োজন। আমাদের দেশে রয়েছে ৭.৮ শতাংশ।তিনি বলেন, আমরা এলিভেটেড টাওয়ার কার পার্কিং নির্মাণ করতে পারি। এটা করতে পারলে প্রতিটি টাওয়ারে ৫০টি গাড়ি পার্কিং করা যাবে। এ টাওয়ার নির্মাণ করতে এক কাঠা জমি প্রয়োজন। খরচ হবে চার কোটি টাকা। এটা একটি সংক্রিয় কার পার্কিং। লিফটের মতো করে গাড়িগুলো উপরের তলায় রাখা হবে বলে তিনি পাওয়ারপয়েন্টে দেখান।

বিআরটিসির পরিচালক (টেকনিক্যাল) মাহবুবুর রহমান জানান, দেশের মোট যানবাহনে মাত্র ০.১ শতাংশ বিআরটিসি পরিচালনা করে। এতে বাসের সংখ্যা এক হাজার, ট্রাকের সংখ্যা ১৫০।

সভায় সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের সভাপতি এ আই মাহবুব উদ্দিন আহমেদ। আরও বক্তব্য দেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য সুব্রত চৌধুরী, জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য নাদের চৌধুরী, ঐক্য ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহ তারেক, বিকল্প ধারার সাংগঠনিক সম্পাদক ওমর ফারুক।